১৮/০৬/২০২৪ ইং
Home / শিক্ষা / অন্যান্য / কুরআন-হাদিসের দৃষ্টিতে পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য

কুরআন-হাদিসের দৃষ্টিতে পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য

কুরআন-হাদিসের দৃষ্টিতে পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য

ইসলামিক বার্তাঃ

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ কোনটি সে বিষয়ে খবর দেব না?  আর তা হলো- আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া। (বুখারি শরীফ- ৫৯৭৬; মুসলিম শরীফ- ৮৭)।

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত,  রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,‘তিনটি দোয়া কবুল হয়, যাতে কোনরূপ সন্দেহ নেই। ১. পিতা-মাতার দোয়া, ২. মুসাফিরের দোয়া ও ৩. মজলূমের দোয়া’। (আবু দাউদ শরীফ- ১৫৩৬)।

এক কথায় সন্তানের জন্য বা সন্তানের বিরুদ্ধে পিতা-মাতার যেকোনো দোয়া বা বদদোয়া নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট কবুল হয়ে যায়। অতএব, এ ব্যাপারে পিতা-মাতা ও সন্তানদের সর্বদা সাবধান থাকতে হবে। যেন সন্তানের কোনো আচরণে পিতা-মাতার অন্তর থেকে ‘উহ্’শব্দ বেরিয়ে না আসে। অথবা সন্তানের প্রতি রুষ্ট হয়ে পিতা-মাতা যেন মনে বা মুখে কোন বদদোয়া না করে বসেন। যেকোনো অবস্থায় উভয়কে ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং সর্বদা উভয়ে উভয়ের প্রতি সহমর্মী ও সহানুভূতিশীল থাকতে হবে।

হযরত আমর বিন শুআইব তার পিতা হতে, তিনি তার দাদা‘আমর ইবনুল আ’ছ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূল (সাঃ) এর নিকটে এসে বলল, আমার সম্পদ আছে। আর আমার পিতা আমার সম্পদের মুখাপেক্ষী। তখন রাসূল (সাঃ) বললেন, তুমি ও তোমার সম্পদ তোমার পিতা-মাতার জন্য। নিশ্চয়ই তোমাদের সন্তানরা তোমাদের পবিত্রতম উপার্জনের অন্তর্ভুক্ত। অতএব, তোমরা তোমাদের সন্তানদের উপার্জন থেকে ভক্ষণ কর। (আবু দাউদ শরীফ- ৩৫৩০; ইবনু মাজাহ শরীফ- ২২৯১; মিশকাত শরীফ- ৩৩৫৪)।

হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, অন্য হাদিসে রাসূল (সাঃ) বলেন, নিশ্চয়ই সবচেয়ে পবিত্র খাদ্য হলো যা তোমরা নিজেরা উপার্জন কর। আর তোমাদের সন্তানরা তোমাদের উপার্জনের অংশ।  (তিরমিযী শরীফ-১৩৫৮)। উক্ত বিষয়ে হযরত জাবের ও হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর প্রমুখ সাহাবি থেকেও সহিহ হাদিস সমূহ রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রাঃ) বলেন, অনেক সাহাবি ও অন্যান্য বিদ্বানরা বলেন, পিতা-মাতা সন্তানের সম্পদ থেকে যতটুকু ইচ্ছা গ্রহণ করতে পারেন। তবে কেউ কেউ বলেন, কেবল প্রয়োজন অনুপাতে নিতে পারেন। (তিরমিযী শরীফ- ১৩৫৮)।

নেককার সন্তানের সব নেক আমলের সওয়াব তার পিতা-মাতা পাবেন। যদি তারা কাফের বা মুশরিক অবস্থায় মৃত্যুবরণ না করেন। পক্ষান্তরে তাদের পাপের অংশ পিতা-মাতা না পেলেও দুনিয়াতে তারা সন্তানের কারণে বদনামগ্রস্থ হবেন। যেভাবে হযরত নুহ (আঃ) এর অবাধ্য পুত্র জগদ্বাসীর নিকটে চিহ্নিত হয়ে আছে এবং ছেলেকে বাঁচানোর জন্য প্রার্থনা করে হযরত নুহ (আঃ) আল্লাহর নিকট ধমক খেয়েছিলেন। অতএব, সন্তানদের অবশ্যই পিতামাতা, বংশের সম্মান ও সুনামের ব্যাপারে সাবধান থাকতে হবে।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, পূর্বকালে তিন জন ব্যক্তি সফরে বের হয়। পথিমধ্যে তারা মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে পতিত হয়। তখন তিন জনে একটি পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেয়। হঠাৎ গুহা মুখে একটি বড় পাথর ধসে পড়ে। তাতে গুহার মুখ বন্ধ হয়ে যায়। তিন জনে সাধ্যমত চেষ্টা করেও তা সরাতে ব্যর্থ হয়। তখন তারা পরস্পরে বলতে থাকে যে, এই বিপদ থেকে রক্ষার কেউ নেই আল্লাহ ব্যতীত। অতএব, তোমরা আল্লাহকে খুশী করার উদ্দেশ্যে জীবনে কোনো সৎকর্ম করে থাকলে সেটি সঠিকভাবে বলো এবং তার দোহাই দিয়ে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা কর। আশা করি তিনি আমাদেরকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করবেন।

তখন একজন বলল, আমার বৃদ্ধ পিতা-মাতা ছিলেন এবং আমার ছোট ছোট কয়েকটি শিশু সন্তান ছিল। যাদেরকে আমি প্রতিপালন করতাম। আমি প্রতিদিন মেষপাল চরিয়ে যখন ফিরে আসতাম, তখন সন্তানদের পূর্বে পিতা-মাতাকে দুধ পান করাতাম। একদিন আমার ফিরতে রাত হয়ে যায়। অতঃপর আমি দুগ্ধ দোহন করি। ইতিমধ্যে পিতামাতা ঘুমিয়ে যান। তখন আমি তাদের মাথার নিকট দুধের পাত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, যতক্ষণ না তারা জেগে ওঠেন। এ সময় ক্ষুধায় আমার বাচ্চারা আমার পায়ের নিকট কেঁদে গড়াগড়ি করে। কিন্তু আমি পিতামাতার পূর্বে তাদেরকে পান করায়নি। এভাবে ফজর হয়ে যায়। অতঃপর তারা ঘুম থেকে উঠেন ও দুধ পান করেন। তারপরে আমি বাচ্চাদের পান করাই। হে আল্লাহ! যদি আমি এটা তোমার সন্তুষ্টির জন্য করে থাকি, তাহলে তুমি আমাদের থেকে এই পাথর সরিয়ে নাও, তখন পাথর কিছুটা সরে গেল এবং তারা আকাশ দেখতে পেল।

দ্বিতীয় জন বলল, হে আল্লাহ! আমার একটা চাচাতো বোন ছিল। যাকে আমি সবচেয়ে বেশি ভালবাসতাম। এক সময় তাকে আমি আহ্বান করলে সে একশ’ দীনার নিয়ে আসতে বলল। আমি বহু কষ্টে একশ’ দীনার জমা করলাম। অতঃপর তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। কিন্তু যখন আমি তার প্রতি উদ্যত হলাম, তখন সে বলল, হে আল্লাহর বান্দা! আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার সতীত্ব বিনষ্ট করো না। তৎক্ষণাৎ আমি সেখান থেকে উঠে এলাম। হে আল্লাহ! যদি আমি এটা তোমার সন্তুষ্টির জন্য করে থাকি, তাহলে তুমি আমাদের থেকে এই পাথর সরিয়ে নাও।  তখন পাথর কিছুটা সরে গেল।

তৃতীয়জন বলল, হে আল্লাহ! আমি জনৈক ব্যক্তিকে এক পাত্র চাউলের বিনিময়ে মজুর নিয়োগ করি। কাজ শেষে আমি তাকে প্রাপ্য দিয়ে দেয়। কিন্তু সে কোনো কারণবশত তা ছেড়ে চলে যায়। তখন আমি তার প্রাপ্যের বিনিময়ে গরু ও রাখাল পালন করতে থাকলাম। অতঃপর একদিন লোকটি আমার কাছে আসল এবং বলল, আল্লাহকে ভয় কর, আমার ওপর জুলুম করো না। আমার পাওনাটা দিয়ে দাও। তখন আমি বললাম, এই গরু ও রাখাল সবই তুমি নিয়ে যাও। লোকটি বলল, আল্লাহকে ভয় কর, আমার সঙ্গে ঠাট্টা করো না। আমি বললাম, আমি ঠাট্টা করছি না। ওই গরু ও রাখাল সবই তুমি নিয়ে যাও। অতঃপর লোকটি সব নিয়ে গেল। হে আল্লাহ! যদি আমি এটা তোমার সন্তুষ্টির জন্য করে থাকি, তাহলে তুমি আমাদের থেকে এই পাথর সরিয়ে নাও! তখন পাথরের বাকীটুকু সরে গেল এবং আল্লাহ তাদেরকে মুক্তি দান করলেন। (বুখারি শরীফ- ৫৯৭৪-২৯৭২; মুসলিম শরীফ- ২৭৪৩; মিশকাত শরীফ- ৪৯৩৮)।

হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) এর বর্ণনায় এসেছে, لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنَّانٌ وَلاَ عَاقٌّ وَلاَ مُدْمِنُ خَمْرٍ ‘খোটা দানকারী, পিতা-মাতার অবাধ্য ও মদ্যপায়ী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না’।  (নাসাঈ শরীফ- ৫৬৭২; দারেমী শরীফ- ২০৯৪; মিশকাত শরীফ- ৪৯৩৩)।

হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) এর বর্ণনায় এসেছে, ثَلاَثَةٌ قَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِمُ الْجَنَّةَ مُدْمِنُ الْخَمْرِ وَالْعَاقُّ وَالْدَّيُّوثُ الَّذِى يُقِرُّ فِى أَهْلِهِ الْخَبَثَ- অর্থাৎ,‘তিন ব্যক্তির ওপরে আল্লাহ তা’য়ালা জান্নাতকে হারাম করেছেন। মদ্যপায়ী, পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান এবং (দাইয়ূস) যে তার পরিবারে অশ্লীলতা স্থায়ী রাখে’। (আহমাদ শরীফ- ৫৩৭২; নাসাঈ শরীফ- ২৫৬২; মিশকাত শরীফ- ৩৬৫৫)।

হযরত আবু বাকরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেন, বিদ্রোহ এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা অপেক্ষা কোনো পাপই এত জঘন্য নয় যে, পাপীকে আল্লাহ সবচেয়ে দ্রুত এ দুনিয়াতেই শাস্তি দেন এবং আখেরাতেও তার জন্য শাস্তি জমা রাখেন’। (তিরমিযী শরীফ- ২৫১১; ইবনু মাজাহ শরীফ- ৪২১১; আবু দাউদ শরীফ- ৪৯০২; মিশকাত শরীফ- ৪৯৩২)। অর্থাৎ, অন্যান্য পাপের শাস্তি আল্লাহ দুনিয়াতে নাও দিতে পারেন অথবা বিলম্বিত করতে পারেন। কিন্তু বর্ণিত দুই পাপের শাস্তি দুনিয়াতেই আল্লাহ কিছু না কিছু দিয়ে থাকেন। আর আখেরাতে তো থাকবেই। যদি না সে তওবা করে।

পিতামাতা হলেন রেহেমের সম্পর্কের মূল সূত্র। অতএব, পিতামাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার হলো সর্বাগ্রে। অতঃপর পিতৃকুল ও মাতৃকুলের রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়রা এই হাদিসের মধ্যে শামিল। কেননা আল্লাহ বলেন, وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ مِنَ الْمَاءِ بَشَرًا فَجَعَلَهُ نَسَبًا وَصِهْرًا অর্থাৎ, ‘তিনিই মানুষকে পানি হতে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি তার বংশগত ও বিবাহগত সম্পর্ক নির্ধারণ করেছেন (সূরা: ফুরক্বান; আয়াত: ২৫-৫৪)।

Print Friendly, PDF & Email

About newsdesk

Check Also

বঙ্গবন্ধুর ১০৪তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে শওকত ইরফান রিয়াদের উদ্যোগে পবিত্র খতমে কুরআন ও দো’য়া অনুষ্ঠিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *